Image




#আ মরি বাংলা ভাষা

#দেবদত্তা ব‍্যানার্জী


একটু জেদ করেই মিতা ছেলেকে ঐ দূরের কনভেন্টে ভর্তি করেছিল। বাড়ির কাছাকাছি যে দুটো ইংরেজী স্কুল ছিল একটাও কনভেন্ট না এই ছিল মিতার বক্তব্য। রমা দেবী দীর্ঘ দিন শিক্ষকতা করেছেন এই এলাকারই একটি সরকারী বাংলামাধ‍্যম স্কুলে। কিন্তু ওনার পুত্রবধু মিতা এই বাংলা স্কুলের চাকরিকে পাত্তাই দেয় নি কখনো। মিতা নিজেও কনভেন্টে পড়েছে, ছেলেকে ও কনভেন্টে না পড়ালে নাকি ভবিষ্যত নেই......। রমাদেবী দু এক বার বোঝাতে গিয়েও হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। আসলে এ সব নিয়ে ছেলের বৌএর সাথে বেশি কথা বলতে ওনার রুচিতে বাধতো। 

ঋত খুব ভাল ছেলে।খুব বুদ্ধিমান। ওর ওপর যা চাপ দেখে রমাদেবীর খুব কষ্ট হয়। ভোরে উঠে সেই দূরের স্কুলে যেতে হয় ওকে। ফিরতে ফিরতে বিকেলে তিনটা।বিকেলে আবার সাঁতার, ক‍্যারাটে, আ্যবাকাস,আঁকার ক্লাস থাকে।সন্ধ‍্যায় টিচার আসে পড়াতে।


আগে স্কুল থেকে ফিরে একটু ঠাম্মির কাছে আসত ঋত। আজকাল আর সময় পায় না। এর মধ‍্যে মিতার আবার শখ ছেলেকে একটা দাবা নয় টেবিলটেনিস শেখাবে। সাঁতারের সিজিন শেষ হলেই ভর্তি করবে ভেবেছিল মিতা। শুভর আবার ইচ্ছা ছেলেকে গান শেখাবে। কিন্তু মিতার বক্তব‍্য গান প্রাকটিস করার সময় নেই ঋতের। গান কি শুধু শিখলে হয়। প্রচুর গলা সাধতে হয়। তার চেয়ে গিটার ভাল। 


ঋতের ইচ্ছা অনিচ্ছার কথা কেউ ভাবতো না। ওইটুকু ছেলের আবার কিসের ইচ্ছা আর শখ !! ঋত শুধু সব কিছু করেও একটু ঠাম্মার সাথে সময় কাটাতে চাইতো। কিন্তু ওর জীবনে সময়ের যে বড্ড অভাব ছিল।


সে দিন সন্ধ‍্যায় হঠাৎ ঋত এসে ঠাম্মীকে ধরলো -"আমায় একটু বাংলা শেখাবে ঠাম্মী।"

-"আমি তো শেখাতেই পারি, কিন্তু ভাই মা বাবা যদি বকে?"রমাদেবীর কথায় ঋতের মুখটা কালো হয়ে গেলো। মিতার ইচ্ছাতে ওর স্কুলের দ্বিতীয় ভাষা হিন্দি। এ বছর ও ফাইবে ওঠার পর ও তৃতীয় ভাষা বাংলা নিতে চেয়েছিল, কিন্তু ওর বাবা মা বলেছিল ফ্রেঞ্চ নিতে। একটা ফরেন ল‍্যাঙ্গয়েজ শেখা যে ওই ৯বছরের বাচ্চাটার জন‍্য খুব দরকার ছিল।

মাঝে মাঝে রমাদেবী ভাবেন শিক্ষা ব‍্যবস্থাতে কতো পরিবর্তন এসেছে। ওনার শ্বশুরমশাই ছিলেন বাংলাভাষা আন্দলনের একজন শহীদ, আর আজ ওনার নাতির কাছে এই মাতৃভাষা ডেড ল‍্যাঙ্গয়েজ। রমাদেবী বাংলা মাধ‍্যম স্কুলে অঙ্কর দিদিমনি, অথচ নাতিকে ওনার পড়াবার অধিকার নেই। ওনার পুত্রবধু ইংলিশ মিডিয়ামের অথচ নিজে না পড়িয়ে টিচার রেখেছে ঐ ৯বছরের ছেলের জন‍্য। বাড়ীতে ঋতের বাংলা বলা বারন। সারাক্ষন ইংলিশ না বললে নাকি ওর কথা সাবলীল হবে না। 


রমাদেবীর মাঝেমাঝে খুব কষ্ট হয়, অথচ কিছু বলতে পারেন না। মিতাকেও উনি দোষ দিতে পারেন না, চারদিকে সবারি এক অবস্থা, সব বাচ্চা গুলো ছুটে চলেছে। এ এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা। 


মিতার চিৎকারে বাইরে আসতে বাধ‍্য হলেন রমাদেবী। যা বুঝলেন স্কুলের বার্ষিক ট‍্যালেন্ট কনটেস্ট এ ঋত কোন বিষয়েই প্রাইজ পায় নি। খুব বকা খাচ্ছে ছেলেটা। ওর সব বন্ধুরাই নাকি কোন না কোন বিষয়ে প্রাইজ এনেছে। রমাদেবী নাতিকে আড়াল করে নিজের ঘরে নিয়ে আসেন। এরপর শুভ ফিরলে আর এক চোট হবে জানা কথা। বিধস্ত ঋতের সাথে কথা বলে উনি বোঝেন যে বাচ্চাটা কোনো কিছুতেই আনন্দ পাচ্ছে না। অথচ ঋত বরাবর দারুন ছবি আঁকতো। ক‍্যারাটে আর সাঁতারেও প্রচুর প্রাইজ আনতো এতোদিন। ওর জন‍্য খুব কষ্ট হয় রমাদেবীর। গল্প বলে ওকে ভোলানোর চেষ্টা করেন উনি। না খেয়েই ঘুমিয়ে যায় ঋত।


আজ মিতা আর শুভ খুব ব‍্যস্ত। ঋতের স্কুলে আজ আ্যনয়েল ডে, ভাষা দিবস উপলক্ষ‍্যে স্কুলে বাংলা ভাষায় বক্তব্য রাখার প্রতিযোগিতা হয়েছিল, সারা স্কুলের মধ‍্যে প্রথম হয়েছে ঋত। ওর হাতে প্রাইজ তুলে দিয়ে ওকে কিছু বলতে অনুরোধ করলেন প্রিন্সিপাল । শুভ আর মিতা অবাক হয়ে দেখল ঠাম্মীর কাছে শোনা নিজের প্রপিতামহের ভাষা আন্দোলনের গল্প সুন্দর গুছিয়ে বলে চলেছে তাদের কনভেন্টে পড়া ছেলে। রক্তে যে ভাষার টান তাই দিয়ে এক অপূর্ব ছবি একে চলেছে ঋত। অজান্তেই বাবা মা এর চোখ জলে ভরে ওঠে।